মুফতি সাইফুল ইসলাম
ইফতারের সময় মহানবী (সা.) যেসব আমল করতেন
প্রতীকী ছবি
রমজানে দিনভর সিয়াম সাধনার পর সূর্যাস্তের মুহূর্তটি একজন রোজাদারের জন্য বিশেষ রহমতের সময়। এ সময়টি শুধু খাদ্য গ্রহণের নয়; বরং দোয়া, শুকরিয়া ও ইবাদতের এক অনন্য ক্ষণ। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইফতারের সময় কিছু নির্দিষ্ট আমল করতেন, যা উম্মতের জন্য সুন্নত ও অনুসরণীয় আদর্শ হয়ে আছে।
১. সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করা
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইফতারে বিলম্ব করতেন না।
তিনি সূর্যাস্ত নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইফতার করতেন। তিনি বলেছেন : ‘মানুষ তত দিন কল্যাণের মধ্যে থাকবে, যত দিন তারা ইফতার তাড়াতাড়ি করবে।’ (বুখারি, হাদিস: ১৯৫৭ )
ইমাম নববী (রহ.) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, ইফতার দ্রুত করা সুন্নত এবং এতে ইয়াহুদি-নাসারাদের থেকে মুসলিমদের স্বাতন্ত্র্য প্রকাশ পায় (শরহু মুসলিম)। বিলম্ব করা তাকওয়ার পরিচয় নয়; বরং সুন্নতের খেলাফ।
২. খেজুর বা পানি দিয়ে ইফতার শুরু করা
আনাস ইবনু মালিক (রা.) বর্ণনা করেন : ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সালাতের আগে তাজা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। যদি তাজা খেজুর না পেতেন, তবে শুকনা খেজুর দিয়ে। আর যদি তা-ও না পেতেন, তবে কয়েক ঢোক পানি পান করতেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৩৫৬)
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) ‘যাদুল মা‘আদ’-এ লিখেছেন, খেজুর দ্রুত শক্তি জোগায় এবং দীর্ঘ সময় অনাহারে থাকার পর শরীরের জন্য সহজপাচ্য খাদ্য।
আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানও বলে, খেজুরে প্রাকৃতিক গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ থাকায় তা দ্রুত রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক করে। ফলে শরীর ধীরে ধীরে শক্তি ফিরে পায়, হঠাৎ চাপ পড়ে না।
৩. ইফতারের সময় দোয়া করা
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইফতারের মুহূর্তকে দোয়া কবুলের বিশেষ সময় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন : ‘রোজাদারের জন্য ইফতারের সময় এমন একটি দোয়া রয়েছে, যা প্রত্যাখ্যাত হয় না।’ (ইবনু মাজাহ, হাদিস : ১৭৫৩)
ইফতারের সময় তিনি এ দোয়া পড়তেন :
“ذَهَبَ الظَّمَأُ، وَابْتَلَّتِ الْعُرُوقُ، وَثَبَتَ الْأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ”
উচ্চারণ : ‘জাহাবাজ জামাউ; ওয়াবতালাতিল উ’রুকু; ওয়া ছাবাতাল আঝরূ ইনশাআল্লাহ।
’
অর্থ : “তৃষ্ণা দূর হলো, শিরা-উপশিরা সিক্ত হলো এবং ইনশাআল্লাহ সওয়াব স্থির হয়ে গেল।” (আবু দাউদ, হাদিস : ২৩৫৭)
ইবনে হাজার (রহ.) বলেন, এ দোয়ার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নেয়ামতের স্বীকৃতি দেয় এবং রোজা পালনের তাওফিকের জন্য শুকরিয়া আদায় করে (ফাতহুল বারি)।
৪. ইফতারের আগে বা পরে মাগরিবের সালাত আদায়
হাদিসে এসেছে, তিনি হালকা কিছু দিয়ে ইফতার করতেন, তারপর মাগরিবের সালাত আদায় করতেন (আবু দাউদ, ২৩৫৬)। এতে বোঝা যায়, তিনি অতিরিক্ত খাওয়া-দাওয়ায় সময় নষ্ট করতেন না। ইবাদতই ছিল তাঁর মূল অগ্রাধিকার।
এ থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়, ইফতার যেন শুধু ভোজন উৎসবে পরিণত না হয়; বরং তা ইবাদতের প্রস্তুতি হয়।
৫. ইফতারে সংযম ও কৃতজ্ঞতা
রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো অপচয় করতেন না। তিনি অল্প খাবারেই তৃপ্ত থাকতেন। কোরআনে আল্লাহ বলেন : ‘তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না।’ (সুরা : আ‘রাফ, আয়াত : ৩১)
ইমাম কুরতুবী (রহ.) বলেন, এ আয়াত ইফতারসহ সব ভোজনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অতিভোজন শরীর ও আত্মা উভয়ের জন্য ক্ষতিকর (তাফসিরে কুরতুবী)।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও সতর্ক করে যে, দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকার পর হঠাৎ অতিরিক্ত ভোজন করলে হজমে সমস্যা, অস্বস্তি ও রক্তে শর্করার ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে। সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি— অল্প দিয়ে শুরু, ধীরে ধীরে খাওয়া— স্বাস্থ্যসম্মতও বটে।
৬. অন্যকে ইফতার করানো
যদিও এটি সরাসরি ইফতারের মুহূর্তের আমল নয়, তবে ইফতার প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) বিশেষ উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেন :
“যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে তার সমপরিমাণ সওয়াব পাবে, তবে রোজাদারের সওয়াব থেকে কিছুই কমানো হবে না।” (তিরমিজি, হাদিস: ৮০৭)
এ হাদিস ইফতারকে কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত নয়; বরং সামাজিক সহমর্মিতারও শিক্ষা দেয়।
ইফতার ছিল মহানবী (সা.)-এর জীবনে সরল, সংযমী ও ইবাদতমুখী এক অনুশীলন। দ্রুত ইফতার, খেজুর বা পানি দিয়ে শুরু, বিশেষ দোয়া পাঠ, সালাতকে অগ্রাধিকার এবং অপচয় পরিহার— এসব ছিল তাঁর সুন্নাহ।
আজ আমাদের সমাজে ইফতার অনেক সময় আড়ম্বর, অপচয় ও ভোজন প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। অথচ নববী আদর্শ আমাদের শেখায়; ইফতার হলো শুকরিয়া, দোয়া ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মুহূর্ত।
সুন্নাহ অনুযায়ী ইফতার করলে রোজার সৌন্দর্য পূর্ণতা পায়, দোয়া কবুলের আশা জাগে এবং রমজানের প্রকৃত আত্মা জীবন্ত হয়ে ওঠে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফিক দান করুন।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
saifpas352@gmail.com