হাবিবুর রহমান সুজন।
মানবতার নীরব সৈনিক মরহুম মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন
করোনা মহামারির ভয়াবহ সময় ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কঠিন অধ্যায়। আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা ও মৃত্যুভয়ে যখন সাধারণ মানুষ দিশেহারা, ঠিক তখনই মানবতার প্রতীক হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন মরহুম মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। নিজের জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা করে তিনি ছুটে গেছেন অসহায় মানুষের ঘরে ঘরে—ত্রাণ, সহমর্মিতা ও আশার বার্তা নিয়ে।
করোনা কালীন সময়ে অসামান্য মানবিক অবদান ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ মরহুম হেলাল উদ্দিন লাভ করেন করোনা কালীন শ্রেষ্ঠ অ্যাওয়ার্ড। এই পুরস্কার ছিল কেবল একটি সম্মাননা নয়—বরং একজন নিঃস্বার্থ সমাজসেবকের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার প্রতিচ্ছবি।
ঘরে ঘরে ত্রাণ, মুখে মুখে মানবতার গল্প
লকডাউন, কর্মহীনতা ও খাদ্যসংকট যখন দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছিল, তখন মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছেন। চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী নিয়ে তিনি হাজির হয়েছেন অসংখ্য অসহায় পরিবারের দরজায়। অনেক সময় রাতদিন এক করে কাজ করেছেন—কোথাও ক্লান্তির ছাপ নেই, নেই কোনো প্রচারের আগ্রহ।
ত্রাণ দেওয়ার সময় শুধু সামগ্রী নয়, মানুষের মনোবলও জুগিয়েছেন তিনি। একটি আশ্বাস, একটি সান্ত্বনার বাক্য, একটি আন্তরিক হাসিই অনেক মানুষের কাছে ছিল বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা। সে কারণেই একক কোনো মানুষ নয়—অগণিত মানুষের কাছে প্রিয় মুখ হয়ে উঠেছিলেন হেলাল উদ্দিন।
মানুষের উপকারই ছিল জীবনের মূল দর্শন
মরহুম হেলাল উদ্দিন বিশ্বাস করতেন—মানুষের জন্য কাজ করাই সবচেয়ে বড় ইবাদত। ব্যক্তিগত স্বার্থ, লাভ বা পরিচিতির পেছনে তিনি কখনো ছোটেননি। মানুষের উপকার করাই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ও আদর্শ। অসহায় মানুষের কষ্ট তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিত, আর সেই কষ্ট লাঘব করতেই তিনি ছুটে যেতেন সবার আগে।
করোনা সময়ের আগেও তিনি নানাভাবে সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। তবে মহামারির দুঃসময়ে তাঁর মানবিক চেহারাটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সমাজের নিভৃত কোণে থাকা মানুষগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন—মানবতা কখনো থেমে থাকে না।
‘হৃদয়ে বাঘাইছড়ি’র সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত
মরহুম মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন সামাজিক সংগঠন “হৃদয়ে বাঘাইছড়ি”–এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। সংগঠনের বিভিন্ন মানবিক, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমে তিনি ছিলেন অন্যতম চালিকাশক্তি। দুর্যোগকালীন ত্রাণ বিতরণ, অসহায় মানুষের সহায়তা এবং সমাজকল্যাণমূলক উদ্যোগে তাঁর ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়।
সংগঠনের সদস্যরা জানান, হেলাল উদ্দিন ছিলেন একজন নীরব কর্মী—যিনি কাজ করে যেতে ভালোবাসতেন, আলোচনায় থাকতে নয়। তাঁর নেতৃত্ব, সততা ও মানবিক গুণাবলি সংগঠনের জন্য ছিল এক বড় শক্তি।
শূন্যতা, যা সহজে পূরণ হবার নয়
আজ মরহুম মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন আমাদের মাঝে নেই। তাঁর প্রয়াণে পরিবার, স্বজন, শুভানুধ্যায়ী এবং সমাজ হারিয়েছে একজন সত্যিকারের মানবপ্রেমিককে। তিনি চলে গেলেও রেখে গেছেন অসংখ্য মানুষের দোয়া, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার স্মৃতি।
মানুষের হৃদয়ে হৃদয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর মানবিক কাজের মাধ্যমে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন হতে পারে নিঃস্বার্থ সমাজসেবার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
দোয়া ও প্রার্থনা
আল্লাহ তাআলা মরহুম মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন।
তাঁর কবরকে নূরে ভরপুর করুন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজনকে দান করুন ধৈর্য ও সান্ত্বনা।
আমিন।