ধর্ম ডেস্ক
নারীদের ‘মা-বোন’ সম্বোধন সম্মান না প্রতিবন্ধকতা?
বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে অপরিচিত নারীকে ‘মা’ বা ‘বোন’ বলে সম্বোধন করার এক সুদীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বায়ন ও জেন্ডার রাজনীতির প্রভাবে এই সম্বোধনগুলো নিয়ে তাত্ত্বিক বিতর্ক তৈরির চেষ্টা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এগুলো নারীকে কেবল পারিবারিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করে। তবে সমাজতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সম্বোধনগুলো এদেশের প্রেক্ষাপটে নারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও সামাজিক নিরাপত্তার এক অনন্য রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।
লিঙ্গীয় রাজনীতি বনাম আত্মিক বন্ধন: একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
আধুনিক জেন্ডার স্টাডিজের কিছু তত্ত্বে ‘মা’ বা ‘বোন’ সম্বোধনকে ‘প্যাট্রিয়ার্কাল ট্র্যাপ’ বা পুরুষতান্ত্রিক ফাঁদ হিসেবে দেখা হয়। তাদের যুক্তি হলো- নারীকে যখন ঘরোয়া পরিচয়ে ডাকা হয়, তখন তার পেশাদার পরিচয়টি আড়ালে পড়ে যায়। তবে সমাজবিজ্ঞানীরা একে ‘ফিক্টিভ কিনশিপ’ বা ‘কাল্পনিক আত্মীয়তা’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন।
নৃবিজ্ঞানীদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার সমাজ কাঠামোতে অপরিচিত মানুষকে আত্মীয়তার সম্পর্কে আবদ্ধ করার মাধ্যমে এক ধরনের ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ বা সামাজিক চুক্তি তৈরি হয়। যখন একজন পুরুষ কোনো নারীকে ‘বোন’ ডাকেন, তখন সেখানে লালসার পরিবর্তে একটি নৈতিক দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। এটি কেবল পারিবারিক পরিচয় নয়, বরং একটি অভয়বাণী।
ইসলামি দলিল: মর্যাদার এক অনন্য উচ্চতা
ইসলামি জীবনদর্শনে নারীকে কোনো বাণিজ্যিক বা পণ্যগত পরিচয়ে নয়, বরং পরম শ্রদ্ধার আসনে আসীন করা হয়েছে।
সুরা বনি ইসরাঈলে (আয়াত: ২৩) মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহারের যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা কেবল ঘরের ভেতর সীমাবদ্ধ নয়। এটি একজন মুমিনের সার্বিক আচরণের মানদণ্ড।
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর শিক্ষা অনুযায়ী, মা ও বোনের প্রতি সদাচরণ জান্নাতে যাওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত। ইসলামি শরিয়তে নারীকে ‘বোন’ সম্বোধন করার অর্থ হলো- তাকে এক নিরাপদ ও সম্মানজনক সামাজিক বলয়ে অন্তর্ভুক্ত করা। এটি নারীকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে না, বরং সমাজের মূলধারায় তার নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করে।
শহর-গ্রামে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য ও বাস্তবতা
মা-বোন সম্বোধনের ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের প্রেক্ষাপটে সূক্ষ্ম পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।
শহুরে প্রেক্ষাপট: আধুনিক কর্পোরেট কালচারে ‘ম্যাডাম’ বা ‘মিস’ সম্বোধনটি বেশি প্রচলিত। এখানে পেশাদারিত্ব মুখ্য। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, এই যান্ত্রিক সম্বোধনগুলোর চেয়ে ‘আপা’ বা ‘বোন’ ডাকটি কর্মক্ষেত্রে অনেক বেশি সহজ ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে।
গ্রামীণ ও প্রান্তিক প্রেক্ষাপট: গ্রাম বাংলায় আজও ‘মা’ বা ‘মা জননী’ ডাকটি শ্রদ্ধার শিখরে। একজন রিকশাচালক বা সাধারণ শ্রমিক যখন কোনো যাত্রীকে ‘বোন’ বলে সম্বোধন করেন, তখন সেখানে শ্রেণী বৈষম্য ঘুচে গিয়ে এক মানবিক সংযোগ তৈরি হয়। এটি নাগরিক নিরাপত্তাহীনতার এই যুগে নারীর জন্য একটি অদৃশ্য ঢাল হিসেবে কাজ করে।
‘বাবা-ভাই’ সম্বোধন: ভারসাম্যপূর্ণ সামাজিক কাঠামো
সমালোচকরা প্রায়ই প্রশ্ন তোলেন, পুরুষদের ক্ষেত্রে কেন একই ধরনের সম্বোধন ব্যবহৃত হয় না? অথচ বাস্তব চিত্র ভিন্ন। এদেশের সংস্কৃতিতে অপরিচিত বয়োজ্যেষ্ঠকে ‘চাচা’ বা ‘বাবা’ এবং সমবয়সীকে ‘ভাই’ বলা অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয়।
একজন পুরুষ যখন ‘ভাই’ বা ‘বাবা’ হিসেবে নিজেকে পরিচিত দেখেন, তখন তার চরিত্রে এক ধরনের অভিভাবকত্ব ও দায়িত্বশীলতা ফুটে ওঠে। এই ভারসাম্যপূর্ণ সম্বোধন রীতি আমাদের সমাজকে একটি বিশাল একান্নবর্তী পরিবারের রূপ দেয়, যেখানে পারস্পরিক অধিকার ও সম্মানবোধই প্রধান।
ভাষাগত নমনীয়তা ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
সময়ের সাথে সাথে সম্বোধন পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু সেই পরিবর্তনের পেছনে যেন কোনো হীনম্মন্যতা কাজ না করে। মাতৃত্ব বা ভগ্নিত্ব কোনো দুর্বলতা নয়, বরং তা নারীর এক চিরন্তন শক্তি। মা-বোন হিসেবে সম্বোধন করা মানে তাকে ঘরে আটকে রাখা নয়, বরং পাবলিক স্পেসে তাকে পরম আত্মীয়ের মর্যাদা দেওয়া। তথাকথিত ‘লিঙ্গ-নিরপেক্ষ’ বা জেন্ডার-নিউট্রাল শব্দগুলো অনেক সময় সম্পর্কের গভীরতা ও আবেগীয় নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, যা ‘মা-বোন’ ডাকটি অনায়াসেই পূরণ করে।
পরিশেষে বলা যায়, ‘মা-বোন’ সম্বোধনটি আমাদের ভাষাগত ঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ। এটি কোনো তত্ত্বের ফ্রেমে বন্দি বিষয় নয়, বরং আমাদের অস্তিত্বের অংশ। যারা এই সম্বোধনকে অবমাননাকর মনে করেন, তারা সম্ভবত এর অন্তর্নিহিত মমত্ব ও নিরাপত্তার দিকটি অনুধাবনে ব্যর্থ হচ্ছেন। সুস্থ সামাজিক পরিবেশ বজায় রাখতে এবং নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে শ্রদ্ধাশীল করতে এই শাশ্বত সম্বোধনগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম।