ধর্ম ডেস্ক
সিয়াম সাধনার মাহাত্ম্য ও পুরস্কার
পবিত্র রমজান আত্মশুদ্ধি ও খোদাভীতি অর্জনের শ্রেষ্ঠ সময়। এটি ইসলামের অন্যতম রোকন এবং গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বনকারী হতে পারো।’ (সুরা বাকারা: ১৮৩)
সিয়াম সাধনার এই মাসে মুমিন বান্দার জন্য রয়েছে অগণিত সওয়াব ও অশেষ মর্যাদার ঘোষণা। হাদিসের আলোকে রোজার বিশেষ কিছু ফজিলত ও পুরস্কার নিচে তুলে ধরা হলো-
১. রোজাদারের জন্য অসীম প্রতিদান
অন্যান্য নেক আমলের সওয়াব ১০ থেকে ৭০০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হলেও রোজার বিষয়টি স্বতন্ত্র। হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন- ‘আদমসন্তানের প্রতিটি কাজ তার নিজের জন্য, কিন্তু রোজা এর ব্যতিক্রম। রোজা শুধু আমার জন্য, আমিই এরই প্রতিদান দেব।’ (সহিহ মুসলিম)। অর্থাৎ রোজার সওয়াব কোনো হিসাবের ফ্রেমে সীমাবদ্ধ নয়।
২. অতীতের গুনাহ থেকে মুক্তি
নবীজি (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াব লাভের আশায় রমজানের রোজা পালন করে, তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।’ (সহিহ বুখারি)। অপর বর্ণনায় এসেছে, উত্তমরূপে সিয়াম ও কিয়াম পালনকারী রমজানশেষে নবজাতকের মতো নিষ্পাপ হয়ে যায়। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা)
৩. দোয়া কবুল ও জাহান্নাম থেকে নাজাত
রমজানের প্রতিটি দিন ও রাতে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন এবং মুমিন বান্দার দোয়া কবুল করেন। (মুসনাদে আহমদ)। বিশেষ করে ইফতারের মুহূর্তটি ক্ষমা ও মুক্তির জন্য অত্যন্ত কার্যকর।
৪. সুরক্ষার মজবুত ঢাল
যুদ্ধক্ষেত্রে ঢাল যেমন শত্রুর আঘাত ঠেকায়, রোজা তেমনি মুমিনকে পাপাচার ও জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করে। নবীজি (স.) রোজাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচার এক ‘মজবুত দুর্গ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। (মুসনাদে আহমদ)
৫. জান্নাতের বিশেষ দরজা ‘রাইয়ান’
পরকালে রোজাদারদের বিশেষ সম্মানে জান্নাতে ‘রাইয়ান’ নামক একটি দরজা থাকবে। এই দরজা দিয়ে কেবল তাঁরাই প্রবেশ করবেন। (সহিহ বুখারি)। এছাড়া জান্নাত লাভের জন্য রোজার চেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন ইবাদত আর নেই। (সুনানে নাসায়ি)
৬. আল্লাহর বিশেষ সান্নিধ্য ও ভালোবাসা
রোজাদার আল্লাহর অত্যন্ত প্রিয়। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, তাঁর শপথ! রোজাদারের মুখের ঘ্রাণ আল্লাহর কাছে মিশকের (কস্তুরী) সুগন্ধির চেয়েও উত্তম।’ (সহিহ বুখারি)
৭. শয়তানকে শৃঙ্খলিতকরণ
রমজান শুরু হলে শয়তান ও অবাধ্য জ্বিনদের বন্দি করা হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে জান্নাতের সব কটি দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। (শুআবুল ইমান)। পাপিষ্ঠদের তখন হাত গুটিয়ে নেওয়ার এবং সওয়াবপ্রত্যাশীদের অগ্রসর হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
৮. রোজা ও কোরআনের সুপারিশ
কেয়ামতের কঠিন দিনে রোজা ও কোরআন বান্দার হয়ে আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, ‘হে প্রতিপালক! আমি তাকে দিনে পানাহার ও কামাচার থেকে বিরত রেখেছি।’ আল্লাহ তখন উভয়ের সুপারিশ কবুল করবেন। (মুসনাদে আহমদ)
৯. মুমিনের অনাবিল আনন্দ
রোজাদারের জন্য দুটি বিশেষ খুশির মুহূর্ত রয়েছে: একটি ইফতারের সময়, আর দ্বিতীয়টি হলো পরকালে রবের সঙ্গে সাক্ষাতের পরম লগ্ন। (সহিহ বুখারি)
১০. একটি রোজার গুরুত্ব ও সতর্কতা
সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় একটি রোজা ছেড়ে দেওয়া অপূরণীয় ক্ষতি। নবীজি (স.)-এর ভাষ্য অনুযায়ী, শরয়ি কারণ ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে একটি রোজা ভঙ্গ করলে আজীবন নফল রোজা রেখেও তার বিশেষ ফজিলত ও সওয়াব ফিরে পাওয়া সম্ভব হয় না। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা)
রমজান হলো মুমিনের পাথেয় সংগ্রহের শ্রেষ্ঠ সুযোগ। এই মহিমান্বিত মাসের ফজিলত অর্জনে প্রতিটি রোজা সুন্নাহসম্মত তরিকায় পালন করা আমাদের একান্ত কর্তব্য। এই রমজান হোক আমাদের আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া অর্জন ও আমল বৃদ্ধির মাস। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমিন।